ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্মিত ব্যয়বহুল কর্ণফুলী টানেল চালুর পর থেকেই রয়েছে লোকসানে। টোল বাবদ যা আয় হচ্ছে, তা দিয়ে টানেলটির পরিচালন ব্যয়ই উঠছে না। ব্যয় মেটাতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ গুনতে হচ্ছে নির্মাণকারী সংস্থা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষকে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরও এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। সেতু কর্তৃপক্ষের প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর টানেল থেকে লোকসান গুনতে হতে পারে ১৬৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মিত টানেলের ভেতর রাখতে হয় কৃত্রিম অক্সিজেন ও আলো সরবরাহ, সামগ্রিক নিরাপত্তা ও সার্বক্ষণিক জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এ কারণে টানেলটি পরিচালনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। প্রকল্পটির জন্য করা সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, নির্মাণের পর টানেলটিতে দুই ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ দরকার। একটি হলো প্রতিদিনকার রক্ষণাবেক্ষণ—বিদ্যুৎ সরবরাহ, কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ করে অক্সিজেন সরবরাহসহ দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজ এতে অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে প্রতি পাঁচ বছর পর একবার বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ। এছাড়া কর্মীদের বেতন, বিদ্যুৎ-জ্বালানিসহ আনুষঙ্গিক পরিচালন ব্যয়। বিপরীতে আয়ের প্রধান খাত ওই পথে চলাচল করা যানবাহন থেকে আদায় হওয়া টোল।
কর্ণফুলী টানেল পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে চীনের বহুজাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড। কোম্পানিটির সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তি করেছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। চুক্তিমূল্য ৯৮৪ কোটি টাকা।
টানেলটি ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর উদ্বোধন করা হয়। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, উদ্বোধনের পর ২০২৩-২৪ অর্থবছর টানেল রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা বাবদ ব্যয় হয় ১৭৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। একই অর্থবছর প্রায় ৮৭ লাখ টাকা টোল অব্যাহতি দেয় সংস্থাটি। সব মিলিয়ে পরিচালন ব্যয় হয় ১৭৫ কোটি টাকার বেশি। বিপরীতে টোল আদায় হয় কেবল ২৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এ হিসাবে কর্ণফুলী টানেল চালুর পর প্রথম অর্থবছরই লোকসান গুনতে হয় প্রায় ১৪৭ কোটি টাকা।
সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর্ণফুলী টানেল রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা বাবদ ব্যয় হয় ২২২ কোটি ২২ লাখ টাকা। এ অর্থবছর টোল অব্যাহতি দেয়া হয় ৭৮ লাখ টাকার বেশি। টানেলের বাইরে রাস্তা ও মহাসড়ক সংস্কারে ব্যয় হয় আড়াই কোটি টাকা। এর বাইরে স্যানিটেশন ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য ব্যয় হয় আরো ৯০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ২২৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। বিপরীতে মাত্র ৩৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা টোল আদায় হয়েছে। এ হিসাবে গত অর্থবছরে কর্ণফুলী টানেল লোকসান করেছে প্রায় ১৮৯ কোটি টাকা।
চীনের ঋণে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকায় নির্মাণ করা হয়েছে কর্ণফুলী টানেল। সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এ টানেল দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৮ হাজার ৩০৫টি যানবাহন চলার কথা। যদিও বাস্তবে যানবাহন চলছে এর চেয়ে কয়েক ভাগ কম। চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের তথ্য বলছে, গত এপ্রিলে প্রতিদিন গড়ে ৪ হাজার ১৫টি যানবাহন টানেল ব্যবহার করেছে।
কর্ণফুলী টানেল চালুর পর প্রথম দুই অর্থবছরের লোকসানের ধারা চলতি অর্থবছরেও অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষও টানেল থেকে বড় অংকের লোকসান হবে বলে ধরে নিয়েছে। প্রায় ১৭০ কোটি টাকা লোকসানের পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলমান অর্থবছরে কর্ণফুলী টানেল থেকে টোল আদায় হবে ৩৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। বিপরীতে টানেল পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণে সব মিলিয়ে ব্যয় হবে ২০৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
পরিচালন ব্যয় কমিয়ে এবং রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে টানেলটি লাভজনক পর্যায়ে নিতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন গাড়ি যেহেতু কম চলছে, সেহেতু পরিচালনার জন্য জনবলও আমরা কমিয়ে দিয়েছি। আমাদের (বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ) একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি যেখানে যতটা সম্ভব পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় কমিয়েছে। এরই মধ্যে টানেলের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন খাতের ব্যয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা কমানো সম্ভব হয়েছে।’
টানেলের ট্রাফিক বাড়ানোর উদ্যোগও নেয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘লোকসান কমিয়ে আনার জন্য টানেল দিয়ে যাতে ঢাকা-কক্সবাজারের সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়, সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। কর্ণফুলীর আনোয়ারা প্রান্ত ও কক্সবাজার প্রান্ত যে সড়কে মিলেছে, সেখানে একটি সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। সড়কটি নির্মাণ হয়ে গেলে পতেঙ্গা থেকে টানেল দিয়ে এ রাস্তায় সহজেই যানবাহন চলে আসতে পারবে এবং ঢাকা-কক্সবাজারের মধ্যে একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হবে। ঢাকা থেকে যে গাড়িগুলো যাবে, সেগুলো চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ না করেই টানেল দিয়ে অনেক কম সময়ে যাতায়াত করতে পারবে। তখন এ পথে যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যাবে এবং আয়ও বাড়বে।’
এছাড়া টানেলকে ঘিরে অর্থনৈতিক যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে বলে জানান সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ টানেলকে ঘিরে একটি আবাসন প্রকল্প এবং চট্টগ্রাম বন্দরও টানেলকে কেন্দ্র করে কাজ করছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি লাভজনক পর্যায়ে নিতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’